মালভিনাস বিতর্ক : বিশ্বমঞ্চে ভূ-রাজনীতির উত্তাপ

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের রোমাঞ্চকর জয় কেবল মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে দশকের পর দশক ধরে চলা এক গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বে। ফুটবলের সবুজ মাঠ ছাপিয়ে আবারও সামনে চলে এসেছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার পুরোনো ক্ষত। যে দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টাইনদের কাছে যা ‘মালভিনাস’ নামে পরিচিত।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়ের পর ফাইনাল নিশ্চিত করেই উদযাপনে মেতে ওঠেন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়রা। তবে এই উদযাপন কেবল ফুটবলীয় আনন্দের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। নিকোলাস ওতামেন্দি এবং জিওভানি লো সেলসোর মতো তারকা খেলোয়াড়রা মাঠে একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন, যাতে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’।

ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা স্টেডিয়ামের ভেতরে রাজনৈতিক, আপত্তিকর বা উসকানিমূলক ব্যানার ও স্লোগান প্রদর্শন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। ফলে এই ব্যানার প্রদর্শনের দায়ে আর্জেন্টিনা দল এখন ফিফার কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও খেলোয়াড়দের এই আচরণকে আর্জেন্টিনার কট্টর ডানপন্থি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে ব্যাপক সমর্থন দেওয়া হয়েছে।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের এক বীর সেনানীর কন্যা তথা আর্জেন্টিনার বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিলারুয়েল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ খেলা শুরুর আগেই ইংলিশদের ‘দখলদার জলদস্যু’ বলে আখ্যা দেন। জয়ের পর তিনি লেখেন, ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনারই! তারা স্টেডিয়ামে ব্যানার আনতে নিষেধ করেছিল, কিন্তু ভুলে গেছে যে আমরা এটিকে আমাদের রক্তে ও হৃদয়ে বহন করি।’

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাবলো কির্নো আর্জেন্টিনার একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় কলাম লিখে দাবি করেন যে, ফকল্যান্ডস সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে দখল করে রাখা হয়েছে এবং এর ওপর আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক ও আইনগত অধিকার রয়েছে।

আর্জেন্টিনার এই প্রকাশ্য দাবির জবাবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মুখপাত্র সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ফকল্যান্ডসের ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।

ব্রিটেনের পক্ষ থেকে পুনরায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, দ্বীপে বসবাসকারী জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে ফকল্যান্ডসের ৯৯.৮ শতাংশ বাসিন্দা ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার মূল ভূখণ্ড থেকে ৩০০ মাইল দূরে আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জে এখনো রয়েছে ২ হাজার ৫০০ ব্রিটিশ সেনা। ব্রিটেন থেকে ৮ হাজার মাইল দূরের এই দ্বীপপুঞ্জে নিয়মিত ব্রিটিশ সেনারা কসরত করে। বেসামরিক লোকজন রয়েছে সেখানে ২ হাজার ৫০০। বছরে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড আয় হয় মৎস্য খাত থেকে। সেখানে আছে তেল আর বিশুদ্ধ খাবার পানি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফুটবলের এ ঘটনাটি হুট করে ঘটা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনীতির পালাবদল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পেন্টাগনের এক গোপন সূত্র থেকে জানা গেছে, যুক্তরাজ্যকে চাপে ফেলতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জের ব্যাপারে দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মার্কিন প্রশাসনের এই মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই যার সঙ্গে ইসরাইলের ফকল্যান্ডসের ওপর নিজেদের দাবি আদায়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন।

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পরাজয় এবং ৬৫৫ জন সেনার প্রাণহানি দেশটির জাতীয় ইতিহাসে এক বড় ক্ষত। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়েছিল ২৫৫ জন। বিশ্লেষকদের মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ফুটবল জয়কে আর্জেন্টিনার মানুষ কেবল একটি খেলার জয় হিসেবে দেখছে না; বরং এটিকে তারা ৪৪ বছর আগের সেই যুদ্ধের পরাজয়ের এক পরোক্ষ প্রতীকী ‘প্রতিশোধ’ বা সান্ত্বনা হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে মাঠের এই রাজনৈতিক উদযাপন আগামী দিনে লন্ডন ও বুয়েনস আইরেসের কূটনৈতিক সম্পর্কে যে নতুন করে উত্তাপ ছড়াবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *