চা: উপকারের পাশাপাশি রয়েছে কিছু ঝুঁকিও

চা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর কিংবা কাজের ফাঁকে এক কাপ চা অনেকের কাছেই স্বস্তি ও সতেজতার প্রতীক। কালো চা, গ্রিন টি, উলংসহ বিভিন্ন ধরনের চায়ে রয়েছে ক্যাফেইন ও পলিফেনলের মতো উপাদান। এসব উপাদান শরীরে কিছু ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অতিরিক্ত চা পান বা ভুল সময়ে চা খাওয়ার কারণে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

চায়ের সম্ভাব্য উপকারিতা

১. মানসিক সতর্কতা বাড়াতে পারে
চায়ে থাকা ক্যাফেইন মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করে। ফলে ঘুমভাব কমিয়ে সাময়িকভাবে মনোযোগ ও সতর্কতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

২. হৃদ্‌স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা
বিভিন্ন গবেষণায় চা পান ও হৃদ্‌রোগের কিছু ঝুঁকি কম থাকার মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কালো ও গ্রিন টি রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের কিছু সূচকে সামান্য উপকারী প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব গবেষণার অনেকটাই পর্যবেক্ষণভিত্তিক, তাই চাকে রোগ প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় বলা যায় না।

৩. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে
চায়ে থাকা পলিফেনল ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ যৌগ শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে গ্রিন টিতে ক্যাটেচিনজাতীয় পলিফেনল রয়েছে।

৪. কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে
একটি বড় পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় প্রতিদিন দুই বা তার বেশি কাপ কালো চা পানকারীদের মধ্যে সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কিছুটা কম দেখা গেছে। তবে এটি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না; অর্থাৎ শুধু চা পান করলেই আয়ু বাড়ে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

অতিরিক্ত চা পানের ক্ষতিকর দিক

১. ঘুমের সমস্যা ও অস্থিরতা
চায়ে থাকা ক্যাফেইন বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে ঘুমের সমস্যা, নার্ভাসনেস, অস্থিরতা, কাঁপুনি বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।

২. খাবার থেকে আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে
চায়ের পলিফেনল খাবার থেকে বিশেষ করে নন-হিম আয়রন শোষণ কমাতে পারে। যাদের আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের সঙ্গে একই সময়ে চা পান করলে আয়রন শোষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।

তাই আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি থাকলে খাবারের অন্তত এক ঘণ্টা পর চা পান করা ভালো।

৩. খালি পেটে অস্বস্তি হতে পারে
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে খালি পেটে চা পান করলে বমিভাব বা পেটের অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এ ধরনের সমস্যা বাড়াতে পারে।

৪. অতিরিক্ত ক্যাফেইন শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে
একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য মোট দৈনিক ক্যাফেইন গ্রহণ সাধারণত ৪০০ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকলে নিরাপদ বলে FDA ও EFSA-এর তথ্য উল্লেখ করেছে NIH। তবে ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা ভিন্ন হতে পারে। গর্ভাবস্থায় ক্যাফেইনের সীমা আরও কম রাখা প্রয়োজন।

৫. অতিরিক্ত গরম চা এড়িয়ে চলা উচিত
খুব বেশি তাপমাত্রার চা নিয়মিত পান করার সঙ্গে খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর কিছু ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তাই চা পান করার আগে কিছুটা ঠান্ডা করে নেওয়া ভালো।

তাহলে দিনে কতটা চা?

চা একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পরিমিত পরিমাণে চা পান সাধারণত নিরাপদ। তবে চায়ের সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি যোগ করলে মোট ক্যালরি ও চিনি গ্রহণ বেড়ে যায়—তাই কম চিনি বা চিনি ছাড়া চা তুলনামূলক ভালো পছন্দ।

বিশেষ করে যাদের রক্তস্বল্পতা, আয়রনের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা বা ক্যাফেইনে সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের চা পানের সময় ও পরিমাণের বিষয়ে বেশি সতর্ক হওয়া উচিত।

শেষ কথা

চা কোনো জাদুকরী স্বাস্থ্যকর পানীয়ও নয়, আবার সাধারণ পরিমাণে সবার জন্য ক্ষতিকরও নয়। পরিমিত চা পান, খাবারের সঙ্গে না খাওয়া এবং খুব গরম চা এড়িয়ে চলাই হতে পারে সবচেয়ে ভালো অভ্যাস। চায়ের উপকার পেতে হলে পরিমাণের পাশাপাশি চিনি, পান করার সময় এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *