নকশাবহির্ভূত ভবনে ছয়লাব ভোলা পৌরসভা, ১৩ ভবন মালিককে ভাঙার নোটিশ

নকশাবহির্ভূত ভবনে ছয়লাব ভোলা পৌরসভা, ১৩ ভবন মালিককে ভাঙার নোটিশ
ভবন মালিক-পৌর কর্তৃপক্ষ মুখোমুখি; নকশায় পার্কিং থাকলেও ভাড়া দেওয়া হয়েছে

জি এম ছানাউল্লাহ, স্টাফ রিপোর্টার, ভোলা

নকশাবহির্ভূতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ এবং অনুমোদিত নকশায় থাকা পার্কিংয়ের জায়গা ব্যবহার না করায় ভোলা পৌরসভার ১৩ ভবন মালিককে ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সবার ব্যবহারের জন্য পার্কিংয়ের জায়গা উন্মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষের এ নোটিশের পরও ভবন মালিকদের অনেকেই তা বাস্তবায়নে আগ্রহী নন। বরং ভবন নির্মাণের সময় পৌর কর্তৃপক্ষ কেন বাধা দেয়নি—এ প্রশ্ন তুলে উল্টো পৌর প্রশাসনকে দায়ী করছেন তারা।

এদিকে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং পার্কিংয়ের জায়গা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের কারণে ভোলার ব্যস্ত সদর রোডে যানজট ও পথচারীদের ভোগান্তি বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ভবন মালিক ও পৌর কর্তৃপক্ষের মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ভোলা পৌরসভার সদর রোডে থাকা ১৩টি বহুতল ভবনের বিভিন্ন অংশ অনুমোদিত নকশার সঙ্গে মিল নেই। এসব ভবনের অধিকাংশেই বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও শোরুম রয়েছে। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে ভবনগুলোর নকশা অনুমোদনের সময় ১৫ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার সবকিছু মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে কয়েকটি ভবনের নকশায় পার্কিংয়ের জন্য জায়গা রাখা হলেও বাস্তবে সেই স্থানও দোকান বা ব্যবসায়িক কাজে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ফলে ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের যানবাহন রাখার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে সদর রোডে নিয়মিত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং পথচারীদেরও চলাচলে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৭৮১ নম্বর স্মারকে পৌরসভার পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ১৩ ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে নকশাবহির্ভূত অংশ অপসারণ এবং পার্কিংয়ের জায়গা উন্মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নোটিশপ্রাপ্ত ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে—নজরুল ইসলাম গোলদারসহ ছয়জনের মালিকানাধীন গোলদার প্লাজা, আব্দুর রাজ্জাকসহ তিনজনের মালিকানাধীন ইউসিবি ব্যাংক ভবন, হারুনুর রশিদসহ দুজনের মালিকানাধীন মক্কা ভবন, মো. মসিউদ্দিনসহ দুজনের মালিকানাধীন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ভবন, মোসাম্মৎ হামিদা বেগমের মালিকানাধীন কেপ-টাউন মার্কেট, মো. সালাউদ্দিন গংয়ের মালিকানাধীন কর্ণফুলী শপিং কমপ্লেক্স, বিক্রম রায় ও কবিতা রানীসহ সাতজনের মালিকানাধীন ইজি শোরুম, ওমর ফারুক ও জহিরুল ইসলাম নান্নুর মালিকানাধীন মডান ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শ্যামল কৃষ্ণ দত্ত গংয়ের মালিকানাধীন রয়েল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মনির হোসেন পারভেজ ও বজলুর রহমানের মালিকানাধীন ভিক্টর/অমনি শোরুম, মসিহউদ্দিন আল মাঈদের মালিকানাধীন মহাজনপট্টির হোটেল গ্র্যান্ড হলিডে এবং এটিএম মিজানুর রহমানের মালিকানাধীন হাবিব মেডিকেল সেন্টার।

এর মধ্যে বিক্রম রায় ও কবিতা রানীসহ সাতজনের মালিকানাধীন ইজি শোরুম ভবনের বিরুদ্ধে বাংলা স্কুলের পুকুরের সরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগও রয়েছে।

পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নকশাবহির্ভূত অংশ অপসারণে এর আগেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন পৌর প্রশাসক মিজানুর রহমান ভবনগুলোর অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিলেও নানা বাধার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে নোটিশপ্রাপ্ত ভবন মালিকরা পৃথকভাবে হাইকোর্টে রিট করে সময় চেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মামলায় বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি রিয়াজউদ্দিন আহমেদের যৌথ বেঞ্চ নির্ধারিত সময়ের জন্য ভবনগুলো যে অবস্থায় রয়েছে, সে অবস্থায় থাকার সুযোগ দেন। সর্বশেষ এ সময়সীমা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় ভবন মালিক ও পৌর কর্তৃপক্ষের মধ্যে আবারও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে হাবিব মেডিকেল সেন্টারের মালিক চিকিৎসক এটিএম মিজানুর রহমান বলেন, সদর রোডের ভবনগুলোর নিচতলায় ব্যবসা বেশি হওয়ায় সেখানে কেউ পার্কিং রাখতে চান না। ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে যানজটের আশঙ্কা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া হাইকোর্টে রিট করে তারা সময় নিয়েছেন এবং পরবর্তী ব্যবস্থা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হবে বলে জানান তিনি।

ইজি শোরুম ভবনের একাংশের মালিক শ্রী নয়ন সেন বলেন, তারা কোনো সরকারি সম্পত্তি দখল করেননি। তবে নকশায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যবসায়িক এলাকা হওয়ায় তারা সেখানে পার্কিং দিতে আগ্রহী নন। ভবন নির্মাণের সময় পৌর কর্তৃপক্ষ কেন বাধা দেয়নি—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি। বিষয়টির সমাধান আইনি প্রক্রিয়ায় হবে বলে জানান তিনি।

একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন রয়েল ডায়াগনস্টিক ভবনের মালিক শ্যামল কৃষ্ণ দত্ত।

ভোলা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আলহাজ্ব গোলাম নবী আলমগীর বলেন, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। সবাইকে আইন মেনে চলতে হবে। ভবনের নকশায় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে তা অবশ্যই রাখা উচিত। তা না হলে মানুষের চলাচল ও যানবাহন পার্কিংয়ের সমস্যা থেকেই যাবে।

ভোলা পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. বেলাল হোসেন বলেন, আইনি কোনো জটিলতা না থাকলে নকশাবহির্ভূত অংশ ভেঙে ফেলা এবং পার্কিংয়ের জায়গা উন্মুক্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। ভবন নির্মাণের সময় তদারকির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদারকি করার সুযোগ সবসময় নাও থাকতে পারে। তবে সে কারণে ভবন মালিকরা পৌরসভার অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ করবেন এবং পৌরসভা তা মেনে নেবে এটি সম্ভব নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *