গুম মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, এটি বিশ্বের ভয়াবহ অপরাধগুলোর একটি: প্রধানমন্ত্রী

গুমকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং বিশ্বের ভয়াবহ অপরাধগুলোর অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি অতীতে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

শনিবার (২৯ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই বার্তায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুমের শিকার ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে অনেক সময় বিরোধী মত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে গুমের মতো ভয়াবহ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন সরকারের সময়ও ভিন্নমত দমনের ক্ষেত্রে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।

‘আয়নাঘর’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য

বাণীতে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় ধরে গোপনে আটকে রাখার জন্য ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত বিভিন্ন গোপন বন্দিশালা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, অতীত সময়ে শত শত মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি গুমের ঘটনা একটি পরিবারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর স্বজনরা বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার মধ্যে থাকেন।

পুরোনো গুমের ঘটনা তদন্তের কথা

প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার অতীতে ঘটে যাওয়া গুমের ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত ছিল, কীভাবে ঘটনাগুলো সংঘটিত হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কোনো ঘটনার সত্য গোপন না রেখে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা জরুরি।

নতুন আইন করার উদ্যোগ

গুম প্রতিরোধ এবং এ ধরনের অপরাধের প্রতিকার নিশ্চিত করতে সরকার নতুন আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বলেও বার্তায় উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। যথাযথ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া শেষে এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে ভবিষ্যতে গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এখনও নিখোঁজ অনেকেই

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কিছু গুমের ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরে আসার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এখনও অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তিনি ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের মতো নিখোঁজ ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, তাঁদের পরিবারের কাছে এখনও প্রিয়জনের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

গুমের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান

আন্তর্জাতিক আইনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুমের বিচার শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও জড়িত।

ভুক্তভোগীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

এবারের আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Victims First, Actions Now’ সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, গুমের মতো অপরাধ বন্ধ করতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে কার্যকর তদন্ত, বিচার, জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন।

বাণীর শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের ন্যায়বিচার ও অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *