সংবাদ শিরোনাম ::
একনেক বৈঠক স্থগিত, আটকে গেল ১৫ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন ক্যান্সারে আক্রান্ত জেলে সাদ্দামের পাশে ‘তারুণ্যের পথচলা সংগঠন’, পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা বোরহানউদ্দিনে ইয়াছিন পাড়া ডিগ্রি কলেজে ল্যাব সহকারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ চরফ্যাশনে এ পি পি এডভোকেট হিরনের বিরুদ্ধে জেলা জজের গন বিজ্ঞপ্তি তজুমদ্দিনে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে জেলেদের মাঝে ভিজিএফের চাল বিতরণ উপজেলার মেধা তালিকায় ২য় হয়েও নিয়োগ বঞ্চিত লালমোহনের ফয়জুল আলম ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ায় আজ মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের জন্য ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা লালমোহনে এসএসসির বৃত্তির ফলাফলে হা-মীমের শিক্ষার্থীদের চমক শশীভূষণ থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্রসহ তিন ডাকাত সদস্য গ্রেফতার ! চরফ্যাশনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগ, তদারকি নিয়ে প্রশ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
একনেক বৈঠক স্থগিত, আটকে গেল ১৫ উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন ক্যান্সারে আক্রান্ত জেলে সাদ্দামের পাশে ‘তারুণ্যের পথচলা সংগঠন’, পরিবারের হাতে আর্থিক সহায়তা বোরহানউদ্দিনে ইয়াছিন পাড়া ডিগ্রি কলেজে ল্যাব সহকারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ চরফ্যাশনে এ পি পি এডভোকেট হিরনের বিরুদ্ধে জেলা জজের গন বিজ্ঞপ্তি তজুমদ্দিনে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে জেলেদের মাঝে ভিজিএফের চাল বিতরণ উপজেলার মেধা তালিকায় ২য় হয়েও নিয়োগ বঞ্চিত লালমোহনের ফয়জুল আলম ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ায় আজ মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের জন্য ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা লালমোহনে এসএসসির বৃত্তির ফলাফলে হা-মীমের শিক্ষার্থীদের চমক শশীভূষণ থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্রসহ তিন ডাকাত সদস্য গ্রেফতার ! চরফ্যাশনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগ, তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

মেঘনা থেকে সাগর—প্রকৃতির নান্দনিকতায় ভোলা।

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:১৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মেঘনার বিশাল জলরাশি যেন দিগন্ত ছুঁয়ে আছে। কোথাও নদীর বুক চিরে ছুটে চলছে নৌকা, কোথাও সবুজের ভাঁজে হারিয়ে গেছে জনপদ। আবার কোথাও সাগরের নোনাজলে ভিজে আছে নির্জন সৈকত। বিস্তীর্ণ চর, ম্যানগ্রোভ বন, নদীর পাড়ে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা, বন্যপ্রাণীর বিচরণ আর নদীকে ঘিরে মানুষের জীবনযাপন—প্রকৃতি যেন আপন হাতে সাজিয়েছে ভোলাকে।

নদী, সাগর, বন ও চরকে ঘিরে এমন বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একই জেলার মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না। অথচ বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের পর্যটন মানচিত্রে ভোলা এখনো অনেকটাই অচেনা।

বিশ্ব পর্যটন দিবসকে সামনে রেখে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা। পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা গেলে শুধু পর্যটকদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাই সমৃদ্ধ হবে না, বদলে যেতে পারে প্রত্যন্ত জনপদের অর্থনীতিও।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য চর কুকরি-মুকরিতে

ভোলার পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ দক্ষিণের চর কুকরি-মুকরি। মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গড়ে ওঠা এই জনপদে প্রকৃতি এখনো অনেকটাই তার নিজস্ব রূপ ধরে রেখেছে। বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন, সবুজের গভীরতা, বন্যপ্রাণীর বিচরণ এবং শীত মৌসুমে অতিথি পাখির আনাগোনা—সব মিলিয়ে চর কুকরি-মুকরি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।

শহরের কোলাহল থেকে দূরে থাকা এই চর পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশের উপকূলীয় প্রকৃতির ভিন্ন এক রূপ।

নির্জন সৌন্দর্যের তারুয়া সৈকত

চর কুকরি-মুকরির কাছেই ঢালচরের তারুয়া সমুদ্রসৈকত। দীর্ঘ সৈকতজুড়ে নীরবতা, সামনে উত্তাল সাগর আর মাথার ওপর খোলা আকাশ—তারুয়ার সৌন্দর্য অনেকটা নির্জনতার মধ্যেই লুকিয়ে।

বিকেল গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে সাগরের জলরাশিতে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আলো। সূর্যাস্তের সেই মুহূর্তে তারুয়া হয়ে ওঠে আরও মোহনীয়। যথাযথ যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই সৈকতও দেশের পর্যটন মানচিত্রে আলাদা পরিচিতি পেতে পারে।

জ্যাকব টাওয়ারে মিলবে ভিন্ন অভিজ্ঞতা

চরফ্যাশন শহরের আরেক আকর্ষণ জ্যাকব টাওয়ার। উঁচু এই পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে চারপাশের বিস্তীর্ণ জনপদ ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের কারণেও এটি দক্ষিণাঞ্চলের পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি।

এর কাছেই রয়েছে শেখ রাসেল শিশু পার্ক, যা শিশু-কিশোরদের বিনোদনের অন্যতম স্থান।

নদীর পাড়েও ছড়িয়ে আছে সৌন্দর্য

ভোলার পর্যটনের সৌন্দর্য শুধু নির্মিত স্থাপনা কিংবা বিনোদনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়। জেলার প্রকৃত আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে নদীর তীরে, চরের বুকে আর সাগরের কিনারায়।

ভোলা শহরের তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি ও ইলিশা এলাকায় বিকেল নামলেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। নদীর ওপর শেষ বিকেলের আলো, দূরে চলতে থাকা নৌযান আর বাতাসে মিশে থাকা জলরাশির গন্ধ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ।

মেঘনা-তেঁতুলিয়ার তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা নদীর বুকের নৌযান দেখতে দেখতে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার বাইরের পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করতে পারে।

বাড়ছে পর্যটনের পরিধি

ভোলা শহরের ড্রিমল্যান্ড পার্ক এবং বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্কও জেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তেঁতুলিয়া নদীকে ঘিরে থাকা সবুজ প্রকৃতি, খোলা প্রান্তর ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভোলার আকর্ষণ শুধু একটি বা দুটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বরং পুরো জেলাই হয়ে উঠতে পারে একটি দীর্ঘ ভ্রমণকাহিনির অংশ।

পর্যটন উন্নয়নে প্রয়োজন পরিকল্পনা

ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা ও পর্যটকদের আবাসন সুবিধা নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহাম্মদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, ‘ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে কথা বলেছি। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের যাতায়াত ও থাকার সুবিধা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘ভোলায় এসব বিষয় সরেজমিন দেখার পাশাপাশি ঢাকায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব।’

জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ‘ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত ব্যাপক। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভোলায় আসার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের উন্নয়নে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সম্ভাবনাময় স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব পরিকল্পনা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।’

নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস এম বাহাউদ্দিন বলেন, ‘ভোলাকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি ছোট রিসোর্ট ও হোটেল তৈরি এবং সেবামূলক ও সহযোগিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ বাড়াতে হবে।’

হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ‘ট্যুরিজম সার্কিট’

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ট্যুরিজম সার্কিট’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

ভোলা শহর থেকে নদীপাড়ের তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি ও ইলিশা হয়ে বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্ক, এরপর চরফ্যাশনের জ্যাকব টাওয়ার, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, বেতুয়া, চর কুকরি-মুকরি, খেজুরগাছিয়া, ঢালচর ও তারুয়াকে একটি পরিকল্পিত ভ্রমণ রুটের আওতায় আনা গেলে পর্যটকদের সামনে ভোলাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে তুলে ধরা সম্ভব।

বদলাতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি

পর্যটকের পদচারণা বাড়লে এর প্রভাব শুধু দর্শনীয় স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নৌযান ও সড়ক পরিবহন, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ঘিরে তৈরি হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

চরাঞ্চলের মানুষের জন্যও খুলে যেতে পারে আয়ের নতুন সুযোগ। স্থানীয় তরুণদের কেউ হতে পারেন পর্যটক গাইড, কেউ নৌযানচালক, আবার কেউ গড়ে তুলতে পারেন ছোট খাবারের দোকান বা আবাসনসেবা। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবিকার এমন সংযোগই একটি পর্যটনকেন্দ্রকে টেকসই করে তুলতে পারে।

প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টিও জরুরি

তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, খাবারের ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত প্রচার।

একই সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ যে নদী, বন, চর ও সাগর ভোলার পর্যটনের প্রাণ, সেগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে পর্যটনের মূল আকর্ষণই একসময় হারিয়ে যেতে পারে।

ইলিশের পাশাপাশি পর্যটনের জেলা

ইলিশের জেলা হিসেবে ভোলার পরিচিতি বহুদিনের। কিন্তু এই জেলার পরিচয় যে শুধু ইলিশে সীমাবদ্ধ নয়, তা প্রমাণ করার মতো উপাদান ছড়িয়ে আছে চারদিকে।

মেঘনার জলরাশি, তেঁতুলিয়ার স্রোত, বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাস, চরাঞ্চলের সবুজ, ম্যানগ্রোভ বনের নীরবতা আর নদীর পাড়ে অস্তগামী সূর্য—সব মিলিয়ে ভোলা হতে পারে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের এক অনন্য গন্তব্য।

প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা এই সৌন্দর্যকে পরিকল্পিত পর্যটনে রূপ দিতে পারলে বদলে যেতে পারে ভোলার পরিচিতিও। তখন ইলিশের পাশাপাশি নদী, সাগর, চর ও সবুজ প্রকৃতির জেলা হিসেবেও দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হবে ভোলা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :
Development By: sahon srabon

মেঘনা থেকে সাগর—প্রকৃতির নান্দনিকতায় ভোলা।

আপডেট সময় : ০৭:১৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেঘনার বিশাল জলরাশি যেন দিগন্ত ছুঁয়ে আছে। কোথাও নদীর বুক চিরে ছুটে চলছে নৌকা, কোথাও সবুজের ভাঁজে হারিয়ে গেছে জনপদ। আবার কোথাও সাগরের নোনাজলে ভিজে আছে নির্জন সৈকত। বিস্তীর্ণ চর, ম্যানগ্রোভ বন, নদীর পাড়ে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা, বন্যপ্রাণীর বিচরণ আর নদীকে ঘিরে মানুষের জীবনযাপন—প্রকৃতি যেন আপন হাতে সাজিয়েছে ভোলাকে।

নদী, সাগর, বন ও চরকে ঘিরে এমন বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একই জেলার মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না। অথচ বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের পর্যটন মানচিত্রে ভোলা এখনো অনেকটাই অচেনা।

বিশ্ব পর্যটন দিবসকে সামনে রেখে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা। পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা গেলে শুধু পর্যটকদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাই সমৃদ্ধ হবে না, বদলে যেতে পারে প্রত্যন্ত জনপদের অর্থনীতিও।

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য চর কুকরি-মুকরিতে

ভোলার পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ দক্ষিণের চর কুকরি-মুকরি। মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গড়ে ওঠা এই জনপদে প্রকৃতি এখনো অনেকটাই তার নিজস্ব রূপ ধরে রেখেছে। বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন, সবুজের গভীরতা, বন্যপ্রাণীর বিচরণ এবং শীত মৌসুমে অতিথি পাখির আনাগোনা—সব মিলিয়ে চর কুকরি-মুকরি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।

শহরের কোলাহল থেকে দূরে থাকা এই চর পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশের উপকূলীয় প্রকৃতির ভিন্ন এক রূপ।

নির্জন সৌন্দর্যের তারুয়া সৈকত

চর কুকরি-মুকরির কাছেই ঢালচরের তারুয়া সমুদ্রসৈকত। দীর্ঘ সৈকতজুড়ে নীরবতা, সামনে উত্তাল সাগর আর মাথার ওপর খোলা আকাশ—তারুয়ার সৌন্দর্য অনেকটা নির্জনতার মধ্যেই লুকিয়ে।

বিকেল গড়িয়ে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লে সাগরের জলরাশিতে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আলো। সূর্যাস্তের সেই মুহূর্তে তারুয়া হয়ে ওঠে আরও মোহনীয়। যথাযথ যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই সৈকতও দেশের পর্যটন মানচিত্রে আলাদা পরিচিতি পেতে পারে।

জ্যাকব টাওয়ারে মিলবে ভিন্ন অভিজ্ঞতা

চরফ্যাশন শহরের আরেক আকর্ষণ জ্যাকব টাওয়ার। উঁচু এই পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে চারপাশের বিস্তীর্ণ জনপদ ও প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের কারণেও এটি দক্ষিণাঞ্চলের পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি।

এর কাছেই রয়েছে শেখ রাসেল শিশু পার্ক, যা শিশু-কিশোরদের বিনোদনের অন্যতম স্থান।

নদীর পাড়েও ছড়িয়ে আছে সৌন্দর্য

ভোলার পর্যটনের সৌন্দর্য শুধু নির্মিত স্থাপনা কিংবা বিনোদনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়। জেলার প্রকৃত আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে নদীর তীরে, চরের বুকে আর সাগরের কিনারায়।

ভোলা শহরের তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি ও ইলিশা এলাকায় বিকেল নামলেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। নদীর ওপর শেষ বিকেলের আলো, দূরে চলতে থাকা নৌযান আর বাতাসে মিশে থাকা জলরাশির গন্ধ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ।

মেঘনা-তেঁতুলিয়ার তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা নদীর বুকের নৌযান দেখতে দেখতে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার বাইরের পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করতে পারে।

বাড়ছে পর্যটনের পরিধি

ভোলা শহরের ড্রিমল্যান্ড পার্ক এবং বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্কও জেলার পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তেঁতুলিয়া নদীকে ঘিরে থাকা সবুজ প্রকৃতি, খোলা প্রান্তর ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রাকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভোলার আকর্ষণ শুধু একটি বা দুটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বরং পুরো জেলাই হয়ে উঠতে পারে একটি দীর্ঘ ভ্রমণকাহিনির অংশ।

পর্যটন উন্নয়নে প্রয়োজন পরিকল্পনা

ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা ও পর্যটকদের আবাসন সুবিধা নিয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহাম্মদ সোহেল মঞ্জুর বলেন, ‘ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে কথা বলেছি। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের যাতায়াত ও থাকার সুবিধা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘ভোলায় এসব বিষয় সরেজমিন দেখার পাশাপাশি ঢাকায় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি আমরা বিবেচনা করব।’

জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ গোলাম নবী আলমগীর বলেন, ‘ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা অত্যন্ত ব্যাপক। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভোলায় আসার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের উন্নয়নে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সম্ভাবনাময় স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব পরিকল্পনা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। এ বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে।’

নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব এস এম বাহাউদ্দিন বলেন, ‘ভোলাকে পর্যটন জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি ছোট রিসোর্ট ও হোটেল তৈরি এবং সেবামূলক ও সহযোগিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সুযোগ বাড়াতে হবে।’

হতে পারে পূর্ণাঙ্গ ‘ট্যুরিজম সার্কিট’

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভোলার পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে না দেখে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ট্যুরিজম সার্কিট’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

ভোলা শহর থেকে নদীপাড়ের তুলাতুলি, ইলিশবাড়ি ও ইলিশা হয়ে বোরহানউদ্দিনের ইকোপার্ক, এরপর চরফ্যাশনের জ্যাকব টাওয়ার, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, বেতুয়া, চর কুকরি-মুকরি, খেজুরগাছিয়া, ঢালচর ও তারুয়াকে একটি পরিকল্পিত ভ্রমণ রুটের আওতায় আনা গেলে পর্যটকদের সামনে ভোলাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে তুলে ধরা সম্ভব।

বদলাতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি

পর্যটকের পদচারণা বাড়লে এর প্রভাব শুধু দর্শনীয় স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নৌযান ও সড়ক পরিবহন, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ঘিরে তৈরি হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

চরাঞ্চলের মানুষের জন্যও খুলে যেতে পারে আয়ের নতুন সুযোগ। স্থানীয় তরুণদের কেউ হতে পারেন পর্যটক গাইড, কেউ নৌযানচালক, আবার কেউ গড়ে তুলতে পারেন ছোট খাবারের দোকান বা আবাসনসেবা। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবিকার এমন সংযোগই একটি পর্যটনকেন্দ্রকে টেকসই করে তুলতে পারে।

প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টিও জরুরি

তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, খাবারের ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত প্রচার।

একই সঙ্গে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ যে নদী, বন, চর ও সাগর ভোলার পর্যটনের প্রাণ, সেগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে পর্যটনের মূল আকর্ষণই একসময় হারিয়ে যেতে পারে।

ইলিশের পাশাপাশি পর্যটনের জেলা

ইলিশের জেলা হিসেবে ভোলার পরিচিতি বহুদিনের। কিন্তু এই জেলার পরিচয় যে শুধু ইলিশে সীমাবদ্ধ নয়, তা প্রমাণ করার মতো উপাদান ছড়িয়ে আছে চারদিকে।

মেঘনার জলরাশি, তেঁতুলিয়ার স্রোত, বঙ্গোপসাগরের নোনা বাতাস, চরাঞ্চলের সবুজ, ম্যানগ্রোভ বনের নীরবতা আর নদীর পাড়ে অস্তগামী সূর্য—সব মিলিয়ে ভোলা হতে পারে প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের এক অনন্য গন্তব্য।

প্রকৃতির বুকে ছড়িয়ে থাকা এই সৌন্দর্যকে পরিকল্পিত পর্যটনে রূপ দিতে পারলে বদলে যেতে পারে ভোলার পরিচিতিও। তখন ইলিশের পাশাপাশি নদী, সাগর, চর ও সবুজ প্রকৃতির জেলা হিসেবেও দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হবে ভোলা।